প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য

শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস: তাঁর মুক্তিতে যাঁদের অবদান

63
শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস: তাঁর মুক্তিতে যাঁদের অবদান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন অনেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে গেছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক

জীবনে তিনটি বাঁক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম বাঁক অবশ্যই ১৯৮১ এর ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফেরা। দ্বিতীয় বাঁক হলো ২০০৪ এর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া। আর তৃতীয় বাঁক হলো, ২০০৮ সালে ১১ জুন দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারান্তরীণ থেকে মুক্তি পাওয়া। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে তাঁর তৃতীয় অধ্যায়ে সবচেয়ে বিচক্ষণ, দূরদর্শী এবং সফল।

তাই শেখ হাসিনা সবসময়ই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ যাঁরা তাঁকে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তির লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিল।

আজ বেগম জিয়ার চার মাসের কারাজীবনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই হাসিঠাট্টা করেন। তাঁরা বলেন, বিএনপি বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে একটা আন্দোলনও করতে পারেননি। কিন্তু শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই হলো সত্য যে, আওয়ামী লীগও শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য মনে রাখার মতোই কিছুই করতে পারেনি। বরং অনেক জাঁদরেল নেতারা শেখ হাসিনা যেন কোনো রাজনীতিতে ফিরে আসতে না পারেন সেই চেষ্টা করেছিলেন।

তারপরও প্রয়াত জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা দলের সভাপতির নেতৃত্বের প্রতি অবিচল ছিলেন। তাঁদের কারণে আওয়ামী লীগ অনিবার্য ভাঙনের হাত থেকে মুক্তি পায়। অখণ্ড আওয়ামী লীগ পরোক্ষ ভাবে হলেও শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রয়াত জিল্লুর রহমানের পাশে ছিলেন বেগম মতিয়া চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান খাঁন। শেখ হাসিনার মুক্তির ক্ষেত্রে আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সব মামলায় জামিন নিয়েই শেখ হাসিনা মুক্তি পেয়েছিলেন।

অনেকে বলেন, শেখ হাসিনা প্যারোলে মুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো সব মামলায় জামিন পেয়েই তিনি মুক্তি পান। তাঁর জামিনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন আইনজীবী।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে নেপথ্যে সংলাপ শেখ হাসিনা মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর এই সংলাপের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন দু’জন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী।

শেখ হাসিনার মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁর চিকিৎসকরা। চিকিৎসকরাই প্রথম তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর দাবি তুলেছিলেন। আর এই চিকিৎসক টিমের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। তার সঙ্গে ছিলেন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, ডা. শাহ আলম, ডা. শায়লা খাতুনসহ আরও কিছু চিকিৎসক।

আওয়ামী লীগ সভাপতির মুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আন্তর্জাতিক চাপ। বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী শেখ হাসিনার মুক্তির ব্যাপারে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন এ ব্যাপারে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কথা বলেন। বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত সরকারকেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশকে উত্তরণের জন্য ভারত চাপ দেয় মূলত প্রণব মুখার্জীর কারণেই। আর প্রণব মুখার্জীকে এবং ভারতকে এই মতে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ রেহানা।

শেখ রেহানা এবং সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক প্রভাব বলয়কে কাজে লাগানোর জন্য গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেন। শেখ রেহানা সেসময় দিল্লীতে প্রণব মুখার্জী ছাড়াও সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের অন্যতম সমর্থক ছিল ভারত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের বেশ কিছু বিষয়ে, বিশেষ করে খেলাফতের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শেখ রেহানা এই দূরত্ব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আজ শেখ হাসিনার বিস্ময়কর উত্থান, রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতায় আবির্ভূত হওয়ায় এঁদের অবদান অনস্বীকার্য। এঁদের কাছে শেখ হাসিনা ঋণী।

শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ

আজ ১১ জুন। শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের এই দিনে তাঁর বিরুদ্ধে করা তৎকালীন অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের করা সবগুলো মামলায় জামিন পেয়ে মুক্তি পান তিনি। শেখ হাসিনার মুক্তির মধ্য দিয়ে দু বছর ধরে অবরুদ্ধ থাকা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মুক্তির দ্বার উন্মোচিত হয়।

২০০৭ সালে দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। সামরিক বাহিনী ও দেশের একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বাংলাদেশের বৃহৎ দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে পাঠাতে তুমুল প্রচার-প্রচারণা ও প্রপাগান্ডা চালাতে থাকে, যা ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে দেশের রাজনীতিতে খ্যাতি পায়, যার প্রধান কুশীলব বলে মনে করা হয় তৎকালীন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদকে।

এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসার মাত্র ৬ মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাঁর বাসভবন সুধাসদন থেকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে তাঁর নামে অনেকগুলো মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।

শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

মুক্তি পেয়েই শেখ হাসিনা চিকিৎসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন, যে নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। শেখ হাসিনাকে মুক্তির মাত্র ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় সরকার আর নির্বাচনের গণরায় স্পষ্টভাবে শেখ হাসিনার পক্ষে যায়। এই গণরায়ই প্রমাণ করে দেয়, শেখ হাসিনা সাধারণ জনগণের মধ্যে কতটা জনপ্রিয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্তটি ছিল অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি হঠকারি সিদ্ধান্ত।

এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিজয়ের ফলে অগণতান্ত্রিক-অনির্বাচিত সরকারের বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন নস্যাৎ হয়ে যায়। তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে শেখ হাসিনার এই কারামুক্তি দিবসকে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই কারাভোগ ও কারামুক্তির পর শেখ হাসিনার নবজন্ম হয়, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্ধী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। সেদিনের পর থেকে শেখ হাসিনা আগের শেখ হাসিনা থেকেও অনেক বেশি ক্ষমতাবান হিসেবে বিবেচিত হন যে ক্ষমতা দেশের জনগণ তাঁকে ভালোবেসে দিয়েছে।

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...