প্রচ্ছদ বিশ্ব

কাশ্মীরি তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে জানাজা যেভাবে

21
কাশ্মীরি তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে জানাজা যেভাবে

একজন জঙ্গির মৃতদেহ যখন দাফনের জন্য সবুজ দাফনের কাপড়ে মোড়া হয়, কাশ্মীরি নারীরা সাহস এবং রক্তের বন্দনা করে

গান শুরু করেন।

মৃতদেহ রাখা হয় উঁচু একটি বেদির ওপর যাতে জানাজায় আগত লোকজন তার মুখ দেখতে পায়। তরুণ যুবকরা ভিড় সরিয়ে সামনে এগিয়ে এসে নিহতের কপালে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন। তারপর তারা মৃতের পা ছুঁয়ে সেই হাত নিজেদের সারা শরীরে বোলাতে শুরু করেন। যেন ধর্মীয় আচার পালন করছেন তারা। খবর বিবিসি

এরকম প্রতিটি জানাজার সময় স্রোতের মত মানুষ আসতে থাকে। স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বাতাস। তরুণ যুবকরা মাইক্রোফোনে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানাতে থাকেন। মরদেহ ‘শহীদের কবরে’ শোয়ানোর আগ পর্যন্ত চলছে থাকে এই মাতম।

এপ্রিলে এক বিকেলে কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার ট্রেঞ্জ নামক একটি গ্রামে এরকম এক জানাজায় হাজির ছিলেন হাল্কা-পাতলা এক বৃদ্ধা নারী। পাকা চুল, চোখ বসে গেছে। হাতে একটি পলিথিন ব্যাগ।

‘আমি আমার ছেলেকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছি, ’ক্লান্ত সরু গলায় বিবিসি সংবাদদাতাকে বলেন জুনা বেগম। তার ১৯ বছরের ছেলে উবায়েদ শফি মাল্লা সেনাবাহিনীর সাথে এক বন্দুক লড়াইতে মারা গিয়েছিলেন।

জুনা বেগম বলেন, তিনি উবায়েদকে জন্ম দেননি, কিন্তু তাকে বুকের দুধ খাইয়েছিলেন তিনি।

প্লাস্টিকের চপ্পল পায়ে সাত কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে উবায়েদের জানাজায় হাজির হয়েছিলেন ঐ বৃদ্ধা। নিরাপত্তা রক্ষীরা চেষ্টা করে এসব জানাজায় যেন বেশি মানুষ জড় না হয়। ফলে রাস্তা এড়িয়ে আপেল বাগানের ভেতর ভেতর দিয়ে এসেছিলেন তিনি।

গুলিতে বিকৃত মুখে চুমু দিয়ে হাতের ব্যাগ থেকে কিছু মিষ্টি নিহত তরুণের শবদেহের উপর ছড়িয়ে দেন তিনি। তারপর বক্তৃতা দিতে শুরু করেন উপস্থিত মানুষদের লক্ষ্য করে:

‘তোমরা কি পুলিশ অফিসার হতে চাও?’ উত্তরে সমস্বরে সবাই চিৎকার করে উঠলো, ‘না, কখনই না।’

‘জঙ্গি হতে চাও?’

মানুষজন চিৎকার করে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ চাই।’

পাশের একটি গ্রামের দিকে আঙ্গুল তাক করে ঐ নারী আবারো বলে উঠলেন, ‘বাঘ হতে চাও?’ ঐ গ্রামে নিহত কাশ্মীরী একজন জঙ্গি সামির ভাটের বাড়ি। আগের সপ্তাহে একইরকম এক লড়াইতে তিনি মারা গিয়েছিলেন।

আবারো সবাই সমস্বরে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ হতে চাই।’

ঐ নারীর পরের আহ্বান ছিল, ‘তাহলে চিৎকার করে তা বলো।’

সবাই আবারো সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো- ‘আজাদি’ অর্থাৎ স্বাধীনতা।

গত তিন বছরে এরকম দুই ডজন জানাজা প্রত্যক্ষ করেছেন বিবিসির এই সাংবাদিক। সবগুলোই কাশ্মীরের দক্ষিণের পাঁচটি জেলায়।

কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি আন্দোলনে এমন সংখ্যায় জড়িয়ে পড়েছে , যা গত দশ বছরে দেখা যায়নি। তাদের যেসব ‘আদর্শ যোদ্ধা’ ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের রক্ষায় জীবন বাজি ধরতে এসব কিশোর তরুণরা তোয়াক্কা করছে না।

তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঢিল ছুঁড়ছে। বিদ্রোহীরা যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন এসব কিশোর তরুণরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে। সেসময় তাদের অনেকই মারা যায়। এ বছরই ৩০ জনেরও বেশি কিশোর তরুণ এভাবে মারা গেছে।

২০১৬ সালের জুলাইতে সৈন্যদের সাথে লড়াইতে জঙ্গি নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। সম্প্রতি ওয়ানির বন্ধু এবং জঙ্গি নেতা সাদাম পাদের নিহত হওয়ার পর তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষ যোগ দেয়।

গান স্যালুট
একের পর এক এসব জানাজা থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতায় জড়িত হতে অনুপ্রাণিত হচ্ছে কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম। এদের অধিকাংশের বয়স ১৯৮৯ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী অন্দোলন শুরুর পর। এরা সবাই সংঘাতের সন্তান।

এদের একজন ১৭ বছরের জুবাইর আহমেদ। সাদাম পাদেরের জানাজায় জমায়েত ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী ছয়টি চেক পয়েন্ট বসিয়েছিল। সেগুলো ফাঁকি দিয়ে সে ঐ জানাজায় এসেছিলো। দু বছরে এরকম ১৬টি জানাজায় হাজির ছিল জুবাইর।

অনেক জানাজায় হাতে বন্দুক নিয়ে অনেক যোদ্ধাও হাজির হয় নিহত সতীর্থ যোদ্ধাদের গান স্যালুট দিতে। পাদেরের মা তার ছেলের জানাজায় আসা এমন একজন বিদ্রোহী যোদ্ধার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন – সেও তার ছেলে।

‘একদিন এরাই কাশ্মীরকে ভারতের বাইরে নিয়ে যাবে’- পাদেরের মায়ের এই চিৎকারের সাথে গলা মিলিয়ে ভারত বিরোধী শ্লোগান উঠেছিল জানাজায় হাজির শত শত মানুষের কণ্ঠে।

গত বছর এরকম এক জানাজায় একজন যোদ্ধার পাশে দাঁড়ানো তার ছবি ফেসবুকে বেরুলে, নিরাপত্তা বাহিনী জুবাইরকে গ্রেপ্তার করে। সে জানায়- এখন তার বিরুদ্ধে গাদা গাদা মামলা, ফলে তার কোনো চাকরি হবেনা।

‘একদিন দেখবেন আমিও একে-৪৭ হাতে নিয়ে বাতাসে গুলি ছুঁড়ছি।’

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...