প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

কোটা আন্দোলনের মূল ৪ নেতার একজন রাশেদ খাঁন ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী

215
কোটা আন্দোলনের মূল ৪ নেতার একজন রাশেদ খাঁন ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী

কোটা বিরোধী আন্দোলনের মূল চার নেতার একজন মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী।

এছাড়া আবদুল্লাহ আল মামুন ও কাশ্মির সুলতানা নামে দুজন কর্মকর্তা এবং বিএনপি জামাতের কয়েকজন নেতা, আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়া এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলা করে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। এতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে রাশেদ খানসহ বেশ কয়েকজন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার নেটওয়ার্কে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়ে এসেছে। ‘ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশকারী শিবির-ছাত্রদল, ভিসির বাড়িতে হামলায় জড়িত’ প্রধান শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানে নামে।

জানা গেছে, তারেকের নির্দেশে বিএনপি জামাতের কয়েকজন নেতার অর্থায়নের পরই এ আন্দোলন ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। কোটা আন্দোলন নিয়ে দুটি টিভিসি ও একটি নাটকও তৈরি করা হয়। এছাড়া আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার দুদিন আগে কুষ্টিয়াসহ দেশের কয়েকটি স্থান থেকে শিবির ও ছাত্রী সংস্থার কর্মীদের ঢাকায় জড়ো করা হয়।

এ আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, যে ঘোষণাই দেয়া হোক না কেন দাবি না মেনে আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত করা এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে ও হামলা চালানো হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে সারাদেশে আন্দোলন বিস্তৃত করা। এক পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এনে বিএনপি জামাত একাত্মতা ঘোষণা করলে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপদান করা।

বিএনপি নেতাদের ১৩০ কোটি টাকা উত্তোলনের সংবাদ প্রকাশ ও নেপথ্যের কয়েকজন গোয়েন্দা নজরদারিতে আসার পর এবং শেখ হাসিনার ঘোষণার পর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলেও এ প্লাটফরমটি ধরে রাখার জন্য আমান উল্লাহ আমানসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের বড় অংকের টাকা এবং নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। বিএনপির নেতৃবৃন্দের সাথে আন্দোলনকারীদের লিয়াজোঁ ও সহযোগিতা বিনিময়ে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন দুজন শিক্ষক, একটি পত্রিকার সম্পাদক ও দুজন সাংবাদিক।

পর্যবেক্ষণ করলেই প্রতীয়মান হয় যে, সংবাদ সম্মেলন, আলোচনা, আন্দোলনকারীদের সুবিধা অসুবিধা ইত্যাদি নানা বাহানায় কর্মসূচি আহবানের নামে মঞ্চের কর্মকাণ্ড দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা চলছে। কোটা নিয়ে কোনো মঞ্চ বা প্লাটফরমের নামকরণ এবং তার কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে কর্মসূচি আহবান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অনেকেই।

কোটা আন্দোলনের আহবায়ক কমিটিকে কর্মসূচি অব্যহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে নেপথ্য নীতি নির্ধারকরা। প্রতিটি কর্মসূচির জন্য বিশ লক্ষ টাকা প্রদানের অলিখিত চুক্তি হয়েছে বলেও একটি সূত্র জানায়। গোয়েন্দা নজরদারির কারণে বর্তমানে সরকার বিরোধী অপপ্রচার কমে গেছে কারণ বিএনপি যেমন এটিকে আন্দোলনের সিঁড়ি হিসেবে দেখছে তেমনি শিবির একে ব্যবহার করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চাচ্ছে। তবে বিএনপি-জামাত উভয়েরই লক্ষ্য আগামী নির্বাচনে যেন অনলাইন ও অফলাইনে এ প্লাটফরমকে ব্যবহার করা যায়।

এদিকে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহাম্মদ রাশেদ খাঁনের একাউন্টে শিবিরের সমর্থক হওয়ার বিভিন্ন প্রমাণ মিলেছে। নিজের ফেইসবুক একাউন্টের একটি পাতায় মুহাম্মদ রাশেদ খান লিখেছেন, ‘কোটা বিরোধী আন্দোলনের মুখপাত্রের নামের তালিকা; কেন্দ্রীয় ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় ছাত্র শিবিরের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক সালাউদ্দিন আইয়ূবী, কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের স্কুল কার্যক্রম বিষয়ক সম্পাদক মাশরুর হোসাইন, কেন্দ্রীয় ছাত্র শিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক সালাউদ্দিন মাহমুদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের বিতর্ক বিভাগের সভাপতি আল মামুন রাসেল।’

ফেইসবুকের আরেকটি পাতায় মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন লিখেছেন, ‘একমাত্র ইসলামের ছায়াতলে রয়েছে শান্তি ঠিকানা।’ এই শিরোনামের নিচে রয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের বিকৃত করা ৫টি ছবি। এছাড়া শিবিরের পাতা বাঁশের কেল্লার একাধিক লেখায় লাইক দেয় এই মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোটা বিরোধী আন্দোলনকে চরম সহিংসতায় রূপ দিতে তৎপর ছিল জামায়াত-শিবির ও বিএনপির একশ্রেণীর নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে শিবিরের তৎপরতা ছিল বেশি। তারা দেশজুড়ে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিল। কোটা বিরোধী আন্দোলনের চার নেতার বিষয় সম্পর্কে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করে। সেই চার নেতার একজন হলেন মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। তিনি কোটা বিরোধী আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায় সদর উপজেলার মুরারীদহ গ্রাম। তার বাবার নাম সবাই বিশ্বাস। তিনি একজন রাজমিস্ত্রি।

মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান, তার দুই বোন রয়েছে। মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন সূর্যসেন হলের আবাসিক ছাত্র। তবে সে হলে থাকতো না। ২০১২ সালে সূর্যসেন হলের ৫০৫ নম্বর কক্ষে থাকতো। শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় এবং শিবিরের লেখা বাঁশের কেল্লায় লাইক দেওয়ায় সে হলে থাকতে পারতো না। নিজের গ্রামের বাড়িতেও তার যাতায়াত ছিল না। তবে ঢাকার একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। কোটাবিরোধী আন্দোলনকে নাশকতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল বেশি। ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে চার নেতার সার্বিক বিষয় পাওয়া গেছে। এছাড়া তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও চার নেতার তথ্য উদঘাটন করছে। ইতিমধ্যে মুহাম্মদ রাশেদ খাঁনের শিবিরে সংশ্লিষ্ট থাকার তথ্যটিও তারা পেয়েছে।

এদিকে কোটা বিরোধী আন্দোলনের আবদুল্লাহ আল মামুন ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা ছিল। ২০১৩ এ রাজাকারদের সমর্থনে আন্দোলন সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। অতপর দুই জামাত নেতার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইসলামী ব্যাংকে চাকুরী নেয়। পরবর্তিতে শিবির নিয়ন্ত্রিত একটি কোচিং সেন্টারের সাথে যুক্ত হয়ে ৩৬ তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পাওয়ার পরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াতের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ছাত্রী সংস্থার কয়কজন নেত্রীকে জেহাদী বইসহ গ্রেফতার করা হলে প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট দেয় ফেসবুকে।

এবার মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী আন্দোলনকে সহিংস রূপ দিতে ভিসির বাড়ি হামলাসহ শিবির নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে ও গুজব ছড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তার সহযোগি ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ের কাশ্মির সুলতানা। এছাড়া বিএনপির মহিলা শাখার নেত্রী ও সময় টিভির রিপোর্টার মৌসুমী মৌ বেগম সুফিয়া হলের ঘটনায় গুজব সৃষ্টিসহ বিএনপি নেতাদের সরবরাহকৃত অর্থ ও আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার বিলিবন্টনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে।

আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী অন্য তিন নেতার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। নেত্রকোনার সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের নন্দীপুর গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে হাসান আল মামুন। তিনি কোটা বিরোধী আন্দোলনের আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি ছাত্রলীগের ঢাবির মহসিন হল শাখার সহ-সভাপতি। তার পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বাঁশের কেল্লায় অনেক লেখায় তার লাইক দেওয়া আছে। নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়জুর রহমান খান উমি বলেন, সে শিবিরের কর্মকাণ্ডে জড়িত। গোয়েন্দা সংস্থা তার ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করছে।

কোটা বিরোধী আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরে। বালিয়াডাঙ্গি সমীর উদ্দিন কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিল। সেখানে ছাত্রলীগে যোগ দিতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানে সে শিবিরের কর্মকান্ডে জড়িত। এ কারণে সে ছাত্রলীগের যোগদান করতে পারেনি। এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এসএম হলের তত্কালীন ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হয়। তার ঘনিস্ট বন্ধু বলেন, এখানে এসে শিবিরে যোগ দেয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কর্মকান্ড না থাকায় পরে কৌশলে ছাত্রলীগে যোগ দেয়। কিন্তু আদর্শ বহন করে শিবিরের।

সকলের অভিমত মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে জামায়াত শিবির ও প্রতিক্রিয়াশীলদের যে উত্থান দেখা গেছে তার সমাপ্তি টানা অতি জরুরী। সকলের সচেতন হওয়াও প্রয়োজন কারণ এ প্রথমবারের মত শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থান পেয়েছে। অন্যথায় আগামীতে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। হয়তো পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান বর্জনের দাবিও করা হবে ধর্মের দোহাই দিয়ে। (দৈনিক শরীয়তপুর প্রতিদিন হতে সংগৃহীত)

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...