প্রচ্ছদ স্পটলাইট

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে বিশ্বনেত্রী!

47
বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে বিশ্বনেত্রী!

‘আমার শৈশবের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষার কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে,

ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে, তাল-তমালের ঝোপে বৈঁচি, দিঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে।’

শেখ হাসিনার তাঁর লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইতে এভাবেই নিজের শৈশবের কথা তুলে ধরেন। গ্রামের সেই কিশোরী শেখ হাসিনা, যিনি সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আজ বিশ্বনেত্রী। অতি সাদামাটা হয়েও তিনি অসাধারণ।

দুইবার তাঁকে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রথমবার ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর। বান্দরবনের দূর্গম অঞ্চল থানচিতে। আদিবাসীদের চলাচলের জন্য নির্মিত একটি ব্রীজ উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই সময় তাঁর খুব পাশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। নীলগিরিতে সাংবাদিকদের আপ্যায়ন ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন মানবতার নেত্রী!

দ্বিতীয়বার, ঢাকার মিরপুরে সরকারি এক অনুষ্ঠানে। যাই হোক, নীলগিরিতে শেখ হাসিনা সবার খোঁজ খবর জানতে পাশেই বসলেন এবং খুব কাছ থেকে সবাই তাঁর সঙ্গে ছবি তুললেন। যে কোনো পরিবেশে, যে কোনো শ্রেণি, অবস্থানের মানুষের সঙ্গে খুব সহজে একাত্ম হওয়ার অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে তাঁর। সম্প্রতি শেখ হাসিনা ৬৯ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন, কিন্তু তাঁকে সে তুলনায় অনেক কম বয়সী দেখায়। আমাদের দেশে নারীদের বিষয়ে সাধারণভাবে বলা হয় ‘কুড়িতেই বুড়ি’। অথচ এই বয়সে তিনি কেমন ঝলমলে, সক্রিয় এবং কর্মঠ। কীভাবে সম্ভব?

চিকিৎসকদের মতে, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন দীর্ঘ সুস্থতা এবং কর্মক্ষম থাকার মূল চাবিকাঠি। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জীবনচর্চা সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি জানি না, কিন্তু গণমাধ্যমে দ্বারা কিছুটা ধারণা পাই। বিশ্বাস করি, তিনি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত, মানে সঠিক সময়ে পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় ঘুম-বিশ্রাম নেওয়া এবং ব্যায়াম করা। এ ছাড়া, সার্বিক সুস্থতার জন্য মন ও আত্মার পরিচর্যা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ যা শেখ হাসিনার জীবনযাপনে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

অনেক গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ এবং সামাজিক বন্ধন মানুষের শারীরিক-মানসিক সুস্থতায় বিশেষভাবে জড়িত। স্পষ্টত শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দেশের নামকরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুবাদে, রাজনৈতিক কর্মসূত্রে এবং ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে অনেকের সঙ্গেই তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, যাদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত সামাজিকতা বজায় রাখেন। বন্ধু-পরিচিতজনদের নিমন্ত্রণ করে ঘরোয়াভাবে আপ্যায়ন করা, অতিথিদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানো, কারো অসুস্থতায় তার পাশে ছুটে যাওয়া, প্রিয়জনের প্রতি স্নেহ-মমতা-ভালবাসা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করা, এসবই তাঁর জীবনধারার অংশ। এসব কাজে আন্তরিকতা তাঁর শরীরী ভাষায় সুস্পষ্ট।

শেখ হাসিনামনস্তাত্ত্বিকদের মতে, নানা রকম আবেগ নিয়ে মানুষের মন এবং মনের সুস্থতার জন্য আবেগ যথা সময়ে, যথা স্থানে প্রকাশ করাই উত্তম। অথচ আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সংস্কৃতিতে এক ধরনের ‘ট্যাবু’ আছে, বিশেষ করে মেয়েদের আবেগ প্রকাশে কত না বিধিনিষেধ! যেমন বলা হয়, তুমি অমুক-তমুক বা তোমার এত বয়স, তুমি হইচই আনন্দ করবে না, মেপে মেপে হাসবে, তোমাকে এটা মানায় না, ওটা করা উচিত না…

কিন্তু শেখ হাসিনা এসব ট্যাবু চ্যালেঞ্জ করে যথা সময়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করেন। যেমন, তাঁকে দেখা যায় উচ্ছ্বাস নিয়ে ক্রিকেট খেলা দেখতে, ক্রিকেটারদের সঙ্গে জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করতে, ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সেলফি তুলতে, নাতনির সঙ্গে খেলতে, প্রিয় সংগীত শিল্পীর জন্মদিনে সাধারণের মতো ফোন করে শুভেচ্ছা জানাতে, বিমানযাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে, বিশ্ব রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে আনন্দময় সময় কাটাতে। এসব ছাড়াও তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন, গান শোনেন, বই পড়েন এবং লেখালেখি করেন, যা মন ও আত্মার শুদ্ধতায় সহায়ক।

প্রকৃত দায়িত্বশীল মানুষেরাই নিজেদের মূল্যায়ন করে এবং নিজেদের যত্ন নেয়; প্রকৃত দায়িত্বশীল পেশাজীবীরা নিজেদের উপযুক্তভাবে কর্মক্ষম রাখায় সচেষ্ট থাকেন। এসবই একজন মানুষকে অধিক আত্মবিশ্বাসী করে, আর আত্মবিশ্বাস মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল করে। আত্মমর্যাদাশীল মানুষেরাই অন্যকে মূল্যায়ন করতে পারেন, ভালবাসতে পারেন; নিজ পরিবারকে ভালবাসতে পারেন এবং দেশ-জনগণকে ভালবাসতে পারেন।

দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পরিস্থিতির কারণেই শেখ হাসিনা রাজনৈতিক পেশায় এসেছেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

বিশ্বনেত্রীর আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, শেকড়ের সঙ্গে তাঁর দৃঢ় সংযোগ এবং তা থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা। শৈশব-কৈশোরে গ্রামের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ, খুব কাছ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাদের মানসিকতা, সংস্কৃতি দেখার সুযোগ তাঁকে মানুষের প্রতি অধিক সংবেদনশীল করেছে। অধিকন্তু, অন্যের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ক্ষমতা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং জনসেবার মূল্যবোধ তিনি পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। কারণ, মানুষের আদর্শ-নীতি, মূল্যবোধের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব-কৈশোরে, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে।

বলা হয়, একজন ব্যক্তির বাল্যশিক্ষা-পর্যবেক্ষণ, পারিবারিক আদর্শ, নীতি-মূল্যবোধ তার কর্মজীবন প্রভাবিত করে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এর অনেক উদাহরণ আছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজের বাড়ী তৈরি করে দেওয়ার অঙ্গীকার। এ ছাড়া, তাঁর রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, তাঁর প্রশাসনে সংসদের স্পিকারসহ মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চসংখ্যক নারীর অন্তর্ভুক্তি নারী অধিকারে তাঁর সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতাই প্রকাশ করে। যে কোনো মানুষের মূল্যবোধ শাণিত করে শিক্ষা, সচেতনতা।

শিক্ষা, জ্ঞান-দক্ষতা অর্জন এগুলো চলমান প্রক্রিয়া, যে কোনো পেশাজীবীর উন্নতিসাধনে যা অপরিহার্য। কোনো মানুষই সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী নন, তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষীরা প্রতিনিয়ত নিজের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সচেষ্ট থাকেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে হালনাগাদ রাখার চেষ্টা করেন।

আমাদের দেশে দায়িত্বশীল পদের অনেকেই ‘অহম’-এ ভোগেন এবং মনে করেন, তাঁরা সবই জানেন, তাদের শেখার আর কিছু নেই! এক্ষেত্রেও শেখ হাসিনা ব্যতিক্রম, তাঁর মধ্যে শেখার আগ্রহ এবং তা বাস্তবায়ন করতে দেখা যায় প্রকাশ্যেই। তিনি গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেন যে, তিনি তাঁর পুত্রের কাছ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পাঠ নেন।

কমবয়সী, বিশেষ করে নিজ সন্তানের শিক্ষার্থী হওয়া তাঁর উদার এবং সমতায় বিশ্বাসী মানসিকতার প্রমাণ বহন করে। পোশাক-সজ্জায় শেখ হাসিনা মার্জিত। আমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী তিনি চিরায়ত বাঙালি নারীর পোশাক শাড়ির সঙ্গে লম্বা হাতার ব্লাউজ পরেন, যা দেশে মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদে চলমান আগ্রাসন চ্যালেঞ্জ করে।

কারুকার্যময় মাঝারি (৩-৫ ইঞ্চি) পাড় দেওয়া এক-রঙা জমিনের শাড়িতে তাঁকে অধিক মনোরম দেখায়। অনুষ্ঠান অনুযায়ী, টাঙ্গাইল, সিল্ক, জামদানি শাড়ি পরতে পছন্দ করেন তিনি। জমিনের রঙের সঙ্গে মেলানো একই রঙের সুতার কারুকাজ করা জামদানী শাড়িতে তাঁকে দারুণ দেখায়। শাড়ির পাড়ের প্রধান বা বিশিষ্ট রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ব্লাউজ– একেবারে পরিপূর্ণ সাজ তাঁর! অনেক বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক, দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাজীবীর ফ্যাশন সচেতন হওয়ার কী দরকার?

তবে যে কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বিশেষ সেলিব্রিটি। একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপনের ধরন, ব্যক্তিত্ব, মনোবল, নীতি-মূল্যবোধ, নেতৃত্ব, পেশাদারিত্ব অনেকের জন্যই আদর্শ, বিশেষ করে শেখ হাসিনার মতো একজন সফল নারী প্রধানমন্ত্রী দেশে-বিদেশে অনেক নারীর জন্যই অনুপ্রেরণা!

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...