প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

নবীর বিবাহিত জীবনের একটি অধ্যায়

252
নবীর বিবাহিত জীবনের একটি অধ্যায়

সুষুপ্ত পাঠক

মক্কায় পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যেরূপ প্রভুসুলভ আচরণ করে অভ্যস্থ ছিল, মদিনায় এসে দেখা গেলো মদিনাবাসী তাদের

স্ত্রীদের উপর সেরকম প্রভাব বিস্তার করেন না। হযরত ওমর তখন হিযরত করে মদিনা চলে এসেছেন। তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করলেন, মদিনার নারীদের অনুরূপ তার স্ত্রীও মুখে মুখে তর্ক করা শিখে গেছে। তিনি যে প্রভু সেটি যেন তার স্ত্রী ভুলে গেছেন!

তিনি স্ত্রীকে এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিলে স্ত্রীও মুখের উপর উদাহরণ দিয়ে বললেন, ”আপনাকে প্রতিউত্তর দিলে সেটাকে আপনি খারাপভাবে নিচ্ছেন কেন? আল্লাহর কসম! নবী করিম সা. এর স্ত্রীরাও তাঁর সাথে মুখে মুখে তর্ক করেছেন এবং স্ত্রীদের কেউ কেউ দিন থেকে রাত অবধি তাঁর সাথে কথা পর্যন্ত বলেননি”।

নবীজির সংসারে যে এরকম আগুন জ্বলছে এই প্রথম ওমর জানতে পারলেন। তার কন্যা হাফসা নবীজির একাধিক স্ত্রীর মধ্যে একজন। ওমর জানতেন কিছুদিন আগে নবীজি এক বিদেশেী শাসকের কাছ থেকে মারিয়া নামের একটা দাসীকে উপহার হিসেবে লাভ করেছেন। পোশাক পাল্টে ওমর তখনই নবীজির বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটলেন। সোজা কন্যা হাফসার ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি দিন থেকে রাত অবধি রাসুলুল্লাহ সা. কে রাগান্বিত রেখেছ?” হাফসা স্বীকার করলো ঘটনা সত্য। ওমর মেয়েকে ভর্ৎসনা করে বললেন, “তুমি বিধ্বস্ত পরাজিত নারী! তুমি কি আল্লাহর রাসুলকে রাগান্বিত করে আল্লাহর ক্রোধের কারণ হতে ভীত হও নাই? এভাবে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে”!…

সেই ঘটনার পর একদিন ওমরের আনসার প্রতিবেশী রাতের বেলা তার ঘরের দরজায় জোরে জোরে কষাঘাত করলে ওমর ব্যস্ত হয়ে দরজা খুলে জানতে চান কোন শত্রু আক্রমণ করেছে কিনা। উত্তরে আনসার প্রতিবেশী বলেন, “তারচেয়েও খারাপ, আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ! রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন”!

ওমরের মাথা ঘুরে গেলো। হাফসা যে এরকম কোন সর্বনাশে চলে যাচ্ছে তিনি বুঝতে পারছিলেন। সকালবেলা ওমর নবীজির বাড়ি গিয়ে দেখলেন হাফসা কাঁদছে। ওমর ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “কেন কাঁদছ? আমি কি তোমাকে আগেই সাবধান করিনি?… রাসুলুল্লাহ সা. কি তোমাদের সকলকে তালাক দিয়েছেন?” হাফসা বললো, “আমি জানি না। তিনি সেখানে উপরের ঘরে আছেন”।

ওমর বাইরে বেরিয়ে নবীজির সঙ্গে দেখা করতে তার ভৃত্য’র কাছে অনুমতি চাইতে পাঠালেন। সে দুবার ফিরে এসে জানালেন নবীজি কোন উত্তরই দেননি। ওমর যখন ফিরে আসবেন এমন সময় নবীজির সেই চাকর এসে বলল, নবীজি ওমরকে ডাকছেন। ওমর গিয়ে দেখেন নবীজি একটা মাদুরে শুয়ে আছেন। ওমর প্রথমেই বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কোরায়েশরা নারীদের উপর অধিক কর্তৃত্ব পেতাম, এবং এখানে আমরা যাদের কাছে এসেছি তাদের নারীরা তাদের উপর অধিক কর্তৃত্ব ভোগ করে”। এরপর তিনি তার স্ত্রীর আচরণের কথা বললেন।

নবী ও তার স্ত্রীদের মধ্যে যে কলহ ওমর ভেবেছিলেন তার মেয়ে হাফসা ও আয়েশার মধ্যে বিদ্যমান রেষারেষিই বুঝি কারণ। ওমর জানতেন আয়েশা নবীজি প্রিয় স্ত্রী। সে দেখতেও হাফসা থেকে অনেক বেশি সুন্দরী। এসব কারণে তিনি মেয়েকে সব সময়ই আয়েশার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে নিষেধ করতেন। কিন্তু ওমর জানতেন না এই গৃহদাহের মূলে সম্প্রতি মিশরীয় সম্রাটের পাঠানো উপহার কৃতদাসী মারিয়া কিরবিতিয়া।

ঘটনা হচ্ছে, নবীজি পালা করে তার স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হতেন। যেদিন হাফসার সঙ্গে মিলিত হওয়ার ডেট সেদিন হাফসাকে নবীজি মিথ্যা বলেন তাকে তার বাবা দেখা করতে খবর পাঠিয়েছেন। হাফসাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে সেই সুযোগে মারিয়াকে নবীজি হাফসার ঘরে নিয়ে উঠান। হাফসা বাড়ি গিয়ে জানতে পারেন তাকে তার বাবা কোন সংবাদই দেননি। তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে দেখেন এই অবস্থা। নবীজি ভীত হয়ে বলেন, আমি তাকে (মারিয়াকে) আমার উপর হারাম করে নিলাম। তারপর নবীজি হাফসাকে অনুরোধ করেন সে যেন এই ঘটনা অন্য কারুর কাছে শেয়ার না করেন। কিন্তু হাফসা এই ঘটনা চেপে রাখতে না পেরে আয়েশার কাছে বলে ফেলেন।

সুরা তাহরিমে এরাই হচ্ছে সেই দুইজন নারী যাদের কথা বলা হয়েছে। যদিও হাদিসে এই ঘটনার নেপথ্যে ভিন্ন আরেকটি ঘটনার কথা বলা আছে। যেমন জয়নবের ঘরে নবীজি মধু খেয়ে ফেরার পর হাফসা নবীজিকে বলেন, তিনি মধুর বদলে দুর্গন্ধ যুক্ত কিছু খেয়েছেন। তার মুখে সেই গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নবীজি কসম কাটলেন তিনি আর মধু খাবেন না। নবীজি হাফসাকে অনুরোধ করলেন সে যেন এই কথা আর কারুর কাছে না বলে। কিন্তু হাফসা সেটা আয়েশার কাছে বলে দেয়।

সামান্য এই ঘটনায় নবী তার সব স্ত্রীদের তালাক দিতে মনস্থির করে ফেলবে সেটা একটা পাগলও বিশ্বাস করবে না। তাছাড়া সুরা তাহরিমে পড়ে দেখুন-

  • “হে নবী, কেন তুমি নিষিদ্ধ করেছ, যা আল্লাহ তোমার জন্য বৈধ করেছেন? তুমি চাইছ তোমার স্ত্রীদের খুশী করতে? আর আল্লাহ পরিত্রাণকারী ও অফুরন্ত ফলদাতা (আয়াত-১)।

সামান্য মধু খাওয়া নিয়ে এই আয়াত নাযিল হয়েছে বলে এবার আপনার কাছে মনে হয়? বরং বুখারী শরীফের ভলিউম ৩, বই ৪৩, হাদীস ৬৪৮টি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, যেখানে মারিয়াকে নিয়ে নবীর স্ত্রীদের মধ্যে প্রচণ্ড কলহ শুরু হবার কথা বলা হয়েছে। দাসী মারিয়া নবীজি উপপত্নি ছিলেন এরকম মতই আলেমদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মারিয়াকে নবী বিয়ে করেছিলেন এরকম কোন দলিল নেই।

ইসলামে দাসীদের বিয়ে বর্হিভূত সেক্স করার অনুমতি রয়েছে। সৌদি আরবে কাজ করতে বিদেশী নারী শ্রমিকদের যে “যৌন হয়রানিতে” পড়তে হয় তার মূলেই রয়েছে কুরআনের ৩৩: ৫০ আয়াত, যেখানে বলা হযেছে,

  • “হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন—“।

পরিস্কারভাবে এখানে স্ত্রী ও দাসীদের আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভ্রান্তির কোন সুযোগ নেই। ইসলামে দাসী ও যুদ্ধবন্দিনী নারীদের যে অবাধে সেক্স করার কথা বলা হয়েছে- এটি তার অন্যতম একটি দলিল।

হেফাজত ইসলাম ও ওলামা লীগ স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি থেকে “হিন্দুত্ববাদী” চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে নবীজির জীবনী বাধ্যতামূলক পাঠের যে দাবী জানিয়ে আসছে তার সঙ্গে সহমত জানিয়ে বলতে চাই, সাধারণ মুসলমানদের অবশ্যই তাদের নবী জীবনী জানানোর সময় এসেছে। আর নয় অজ্ঞতা। মানুষকে এখন আসল সত্যগুলো জানতে দিন।

[সহী বুখারী শরীফ, ভলিউম ৩, বই ৪৩, হাদীস ৬৪৮ অবলম্বনে। বি. দ্র: হাদিসের বই ভেদে হাদিস নং মিলতে নাও পারে।]

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...