প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

নওয়াজের মতো দলীয় প্রধানের পদও হারাবেন খালেদা জিয়া?

419
নওয়াজের মতো দলীয় প্রধানের পদও হারাবেন খালেদা জিয়া?

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, দুর্নীতির কারণে কেউ দণ্ডিত হলে তিনি যদি সংসদ সদস্য হবার যোগ্যতা হারান, তাহলে

তিনি দলীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন না। ভারতে স্বাধীনতার পর থেকেই এই ব্যবস্থা চালু হয়ে আছে।

এমনকি কংগ্রেস এবং বিজেপি তাঁদের দলীয় গঠনতন্ত্রে বিধান করেছে যে, দুর্নীতির দায়ে আদালতে দণ্ডিত হলে ওই ব্যক্তির দলীয় সদস্যপদ স্থগিত হবে। দণ্ডের মেয়াদ শেষ হলেই তিনি দলীয় সদস্যপদ ফিরে পাবেন। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেনে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি আজীবন নির্বাচন করার যোগ্যতা হারান।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল কথায় কথায় গণতন্ত্রের কথা বলে। গণতন্ত্রের জন্য তাঁদের কান্না অন্তহীন। কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট যখন নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ করল। তখন তাঁরা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টকেও একই রকম সাহসী হবার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফকে মুসলিম লীগের প্রধান হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করেছে।

সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে, নওয়াজ শরিফ যেহেতু দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত, তাই তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী না থাকতে পারেন, তাহলে দলীয় প্রধানও থাকতে পারেন না। অত্যন্ত সঠিক কথা। পাকিস্তান সবকিছুতে ভারতের বিরোধীতা করলেও, সুপ্রিম কোর্ট ভারতের নীতিই অনুসরণ করল। ভারত নয় এটিই সম্ভবত সুশাসনের নীতি। নওয়াজ শরিফের এই পরিণতি দেখে বাংলাদেশের নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, তাহলে বেগম জিয়ার কি হবে?

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অনেক মিল। দুজনই ইসলামকে রাজনীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। দুজনই বিপুল বিত্তের মালিক। দুজনই বিদেশে প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। দুজনই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নৃশংস। নওয়াজ শরিফের পর বেগম জিয়ারও কি একই পরিণতি হবে?

বাংলাদেশে কিছু মানুষ আছে, কথায় কথায় পাকিস্তানকে উদাহরণ দেন। পাকিস্তানকে অনুকরণীয় মনে করেন। এরা এখন কি বলবেন? জিয়া অরফানেজ মামলায় দণ্ডিত হয়ে কি বেগম জিয়া আর রাজনীতি করার অধিকার রাখেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আইনজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। এটা স্বাভাবিক ন্যায়নীতির সূত্র। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া। ওই দলের নেতাই ক্ষমতায় গেলে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হবেন। তাই একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান যদি সরকার প্রধান হবার অযোগ্য হন, তাহলে অবশ্যই তাঁর নির্বাচন করার যোগ্যতা থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যুতেই হাইকোর্টে রিট হয়। আবার আমরা কথায় কথায় রাজনীতিকে দুর্নীতি ও কলঙ্কমুক্ত করতে চাই। তাই, এখন কি আমরা সোচ্চার হতে পারি না এই দাবিতে যে, দণ্ডিত দুর্নীতিবাজরা দলের নেতৃত্ব থাকতে পারবেন না, তা সে যে দলেরই হোক না কেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব হারানোর পর এবার দলীয় প্রধানের পদে থাকার অধিকারও হারালেন নওয়াজ শরিফ।

বুধবার পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের এক রায় তার এ পরিণতি ডেকে এনেছে।

নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীত্ব হারানোর পরও তার দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ’ (পিএমএল-এন) এর এমপি’দের যে বৈধ সংশোধনীর বলে তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, আদালতের রায়ে তা উল্টে গেল।

সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ থেকে প্রধান বিচারপতি সাকিব নাসির বলেছেন, “নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কাগজপত্র থেকে পিএমএল-এন এর প্রেসিডেন্ট হিসাবে নওয়াজ শরিফের নাম মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

“ফলে নওয়াজ শরিফ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন বা যেসব আদেশে অনুমোদন দিয়েছেন সেগুলো আর প্রযোজ্য নয় বলেই ধরা হবে।”

নওয়াজকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষণার ছয়মাস পর সুপ্রিম কোর্ট এ রায় দিল। পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি মামলার রায়ে গত বছর জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।

আর এবারের ঘোষিত নতুন রায়ের ফলে পাকিস্তানে ৩ মার্চে অনুষ্ঠেয় সিনেট নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়ল। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এন এর প্রার্থীরা আর বহাল থাকতে পারবেন না। কারণ, তাদেরকে মনোনীত করেছিলেন নওয়াজ।

পিএমএল-এন প্রধানের পদ থেকে নওয়াজকে সরিয়ে দিতে বিরোধী দলগুলোর যে ১৭ জন সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন, তাদের একজনের আইনজীবী ফয়সাল চৌধুরী বলেছেন, “আদালতের রায়ে গত জুলাই থেকে নওয়াজের নেওয়া সব সিদ্ধান্তসহ নির্বাচনের জন্য তার সব মনোনয়নই অকার্যকর হয়ে গেছে।”

তবে তিনি বলেন, “প্রার্থীরা এখনও সিনেট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। দলীয় প্রার্থী হিসেবে নয়।”

নওয়াজের গড়া পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে (ন্যাশনাল এসেম্বলি) সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। আগামী ৩ মার্চে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট নির্বাচনেও দলটি জয়ী হওয়ার আশায় আছে।

কারণ, পিএমএল-এন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আবারও নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হবে।

এর আগে আরো দুই বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নওয়াজ কোনোবারই মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি।

১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে এবং ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্টের আদেশে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়।

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...