বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্ন

108
বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্ন

গণপরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্যে এখন অচল রাজধানী ঢাকা। অথচ ১৩ বছর আগে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায়

অগ্রাধিকার কর্মসূচি ছিল গণপরিবহন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।

কিন্তু এত বছরেও বাস চলাচলের পথ পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়ার পর আনিসুল হক নিজের অদম্য ইচ্ছায় এ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য অনবরত চেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্নের গণপরিবহনব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। মেয়র আনিসুল হকের প্রয়াণের পর তাঁর ইচ্ছা ও উদ্যোগের প্রতি সম্মান জানিয়ে চলছে কর্মযজ্ঞ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাসব্যবস্থা আধুনিকায়নের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। আগামী জানুয়ারির মধ্যে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কাছে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকার বাস খাত আধুনিকায়ন ও বাস রুট পুনর্বিন্যাস প্রকল্পের পরামর্শক এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছি। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকায় ৩০ শতাংশ যানজট কমে যাবে। ‘

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, গত অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত বিভিন্ন ধরনের গাড়ির সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৭৪ হাজার।

এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) ও মোটরসাইকেলের হার সবচেয়ে বেশি। আর দেশে নিবন্ধিত মোট প্রাইভেট কারের ৭৫ শতাংশই ঢাকায়। সেখানে বাস ও মিনিবাস চলাচল করছে ছয় হাজার।

এ অবস্থায় ছোট গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে প্রকল্পে আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস, সাধারণ বাস কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরামর্শক এস এম সালেহ উদ্দিন।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত প্রস্তাবে তিন হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাসের পথ চলাচল পুনর্বিন্যাসসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবে তখনকার ১৭৪টি রুটকে (বর্তমানে এই সংখ্যা ২৮৯) ২২টিতে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। ২২ রুটে চলাচল করবে ছয়টি কম্পানির ছয়টি নির্দিষ্ট রঙের বাস। কম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত করতে হবে প্রতিটি কম্পানিকে। বাসের মালিকানা থাকবে বর্তমান বাস কম্পানির মালিকদের কাছেই। তবে বাসের অনুপাতে হিস্যা (শেয়ার) নির্ধারিত হবে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের পুরনো দুই হাজার ৯০৪টি মিনিবাস ও ৮৬২টি বাস বাতিলের করতে হবে। এর বদলে কেনা হবে চার হাজার নতুন বাস। এর মধ্যে থাকবে ৫০ আসনের তিন হাজার ২৫০টি সাধারণ বাস। ৫০০টি এসি বাস। আর ২৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস। বাস কেনায় সব মিলে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

তবে মেয়াদ শেষ হওয়া দুই হাজার ৩০০ বাসের বাহিরের কাঠামো পুনর্নির্মাণ করা হবে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি টাকা।

বাস কেনা ও পুনর্নির্মাণে মালিকদের বিনিয়োগ করতে হবে ২৫ শতাংশ। বাকি অর্থ সরকার সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ হিসেবে দেবে। পাঁচ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন বাস মালিকরা। বাতিল করা হলে তিন হাজার ৭৬৬ বাসের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ৩০০ কোটি টাকা।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। এসি বাস ৬০ লাখ টাকা। আর্টিকুলেটেড বাসের দাম ধরা হয়েছে এক কোটি টাকা। প্রতিটি বাস পুনর্নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আট লাখ টাকা। বাস কেনা ও পুনর্নির্মাণে মালিকদের বিনিয়োগ লাগবে ৪৭২ কোটি টাকা।

নির্ধারিত বাস স্টপেজ নির্মাণ, আলাদা বাস লেন করা, ই-টিকিটিংসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা।

বিভিন্ন সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকায় ৬০ শতাংশ যাত্রী গণপরিবহন ব্যবহার করে। গণপরিবহনের প্রধান অনুষঙ্গ বাস ও মিনিবাস।

ডিএনসিসির প্রায় দুই বছর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে বাস চলাচলের রুট পুনর্বিন্যাস, নতুন বাস কেনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে জোর দেয়। তাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ডিএনসিসির সদ্যঃপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হক।

পরামর্শক এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘মেয়র আনিসুল হক অসুস্থ থাকার সময়ে সম্প্রতি প্যানেল মেয়রকে নিয়ে বৈঠক করেছি। আগামী জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করব। ‘

বাস মালিকদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা জানিয়ে সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রায় তিন হাজার ৫০০ বাস মালিক ও নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছি। নতুন বাস কিনতে ও পুরনো বাস পুনর্নির্মাণে সরকারি সহায়তা কী হতে পারে, এ নিয়ে বৈঠক করেছি। ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা হয়েছে। ‘

১৬টি বিষয় নিয়ে বাস মালিক ও নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে বলে জানান এই পরামর্শক। ডিটিসিএ, বিআরটিএসহ অংশীজন সবার মতামত নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ সালেহ উদ্দিন আরো জানান, নতুন বাস রাখার জন্য চারটি ডিপো করা হবে সরকারি ব্যয়ে। এ জন্য জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। আর চালকদের প্রশিক্ষণে দুটি কেন্দ্র করা হবে বলেও তিনি জানান।

কিন্তু শীর্ষ পরিবহন নেতাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের এ পরিকল্পনার শুরু থেকে তাঁরা থাকলেও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে তাঁদের ডাকা হচ্ছে না।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই বহু বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। আমি মেয়র, অর্থমন্ত্রী, অর্থসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের সঙ্গে এ উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেছি। মেয়র আনিসুল হক অসুস্থ হলে আর বৈঠকে ডাকা হয়নি। এখন শুনছি, এটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। গাড়ির দাম কত ধরা হচ্ছে তার চূড়ান্ত তথ্য আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের এড়িয়ে এ উদ্যোগ কত দূর এগোবে, এ নিয়ে সন্দেহ আছে।’

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের বাস সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার বা মেট্রো রেল বা বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। টাকার ভারে এসব প্রকল্প হচ্ছে; কিন্তু বাসব্যবস্থা সংস্কারে অর্থ নেই, একেক সংস্থা একেকভাবে সমীক্ষা করছে। আমরা ২০১৬ সালে সমীক্ষা করে বলেছি, ১০টি কম্পানি করতে হবে। মেট্রো রেল ও বিআরটি হলে ১৭ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা যাবে। তবে বাস খাত সংস্কার করে শৃঙ্খলা আনলে তার চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে। কিন্তু এদিকে কারোরই নজর নেই।’

বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গণির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘বাস চলাচলের নৈরাজ্য দূর করতে এ ধরনের কাজ আগেই করা উচিত ছিল। নতুন নতুন ফ্লাইওভার যানজট কমায়নি; বরং যানজট এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে বাস রুট পুনর্বিন্যাস ও কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার বিকল্প নেই। তাতে চালকরা যাত্রী দেখলেই রাস্তায় বাস থামাবে না।’

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...