সেক্যুলার নয় ‘ইসলামের রক্ষক’ আ. লীগের ঝোঁক ইসলামপন্থীদের দিকে

71
সেক্যুলার নয় ‘ইসলামের রক্ষক’ আ. লীগের ঝোঁক ইসলামপন্থীদের দিকে

আওয়ামী লীগ সব সময়ই মনে করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সকল শক্তি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক।

যেকোনো পরিস্থিতিতে বাম প্রগতিমনস্ক মানুষরা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবে। উদারনৈতিক মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও আওয়ামী লীগের নানা দোষ-ত্রুটি মেনে নিয়েও তাঁদের নিজের দল মনে করে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশের সব মানুষই মনে করেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া তাঁদের সমানে কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগই এখন মুক্তবুদ্ধির, প্রগতিবাদী এবং সংখ্যালঘুদের থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে।

আওয়ামী লীগ এখন দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল এবং ইসলাম পছন্দ দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, ইসলাম পছন্দ দলগুলোর সঙ্গে প্রণয়, বিএনপির ভোট ব্যাংকে ভাঙ্গন ধরাবে।

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্যতা এখন আর নতুন নয়। ২০১৩ সালের এপ্রিলে হেফাজত তাদের ঢাকা লংমার্চের নামে জ্বালাও, পোড়াও অগ্নিসংযোগ করে ঢাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সরকার তাদের ঢাকা অবস্থান কঠোরভাবে দমন করে। কিন্তু এরপরই দৃশ্যপটে পরিবর্তন হতে থাকে।

‘গণজাগরণ মঞ্চ’কে ত্যাগ করে আওয়ামী লীগ হেফাজতমুখী হয়ে যায়। হেফাজতের দাবি মেনে সরকার কওমী মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। হেফাজত আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণাও দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক এখন গোপন বিষয় নয়। পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাস থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গন থেকে ভাস্কর্য সরানো ইত্যাদি নানা স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সরকার হেফাজতের পরামর্শে নিয়েছে বলেই সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। শুধু হেফাজত নয়’ আটরশি পীরের জাকের পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মতো দক্ষিণ ধারার মৌলবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্য এবং গোপনে যোগাযোগ রাখছে।

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর মধ্যে ১৩টি দল ইসলাম পছন্দ, প্রতিক্রিয়াশীল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ মধ্যপন্থার দল ১৯টি। বামপন্থায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১০ টি।

বাম ঘারানার ১০টি দলের মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব এখন পুরোনো। বাসদও আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। গণতন্ত্রী পার্টি এবং ন্যাপের একাংশও ১৪ দলীয় জোটের বাইরে। ওয়াকার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল ও দুই জাসদই মূলত: ১৪ দলের মূল শরীক। সেখানেও তাঁদের অবহেলার অভিযোগ আছে।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১৪ দলের বাইরে থাকা বাম দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে তেমন আগ্রহী নয় তারা। বরং ইসলাম পছন্দ দলগুলোর ব্যাপারেই আওয়ামী লীগের আগ্রহ।

ইসলাম পছন্দ দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিশ ও ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সদস্য। এই দুটি দলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টি এবং জঙ্গিবাদকে লালন করার অভিযোগ রয়েছে। এ দুটি দলকে আওয়ামী লীগ নিষ্ক্রিয় করতে চায়। আর জামাতকে ঢেলে সাজিয়ে বিএনপি জোটের বাইরে আনার একটি প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ ৯১ সালে নির্বাচনের পরাজয়ের পর থেকেই ধর্মীয় ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ তার অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনা নিয়ে গর্ব করা বন্ধ করে দিয়েছে। ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বললেও দলটি ‘রাষ্টধর্ম ইসলাম’ বাদ দেয়নি। সেক্যুলার নয় বরং ‘ইসলামের রক্ষক’ হিসেবেই পরিচয় দিতে এখন আওয়ামী লীগ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সকল ধর্মের পবিত্রতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে ।’ তবে তিনি মনে করেন ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিরামহীন প্রচারণা হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ইসলাম বিরোধী হিসেবে প্রচারের চেষ্টা হয়েছে।

সম্ভবত এ কারণেই আওয়ামী লীগ ক্রমশ তার রাজনীতিতে ধর্ম বিশেষ করে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্মকে গুরুত্ব দিতে চাইছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের এই কৌশলের হীতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

মুক্তবুদ্ধির মানুষ, প্রগতিশীল, রাজনৈতিক মুক্তি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষদের আস্থা হারাতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। নতুন বন্ধু খুঁজতে গিয়ে আওয়ামী লীগ কি তার পুরোনো, পরীক্ষিত বন্ধুদের হারাবে?

আওয়ামী লীগের চিরচেনা ভোট ব্যাংকে কি ফাটল ধরাতে এই দক্ষিণপন্থী নীতি? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সামনের দিনগুলোতে।

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...