রোহিঙ্গা সংকটের ৩ কারণ: তেল, ব্যর্থ গণতন্ত্র ও ভণ্ড সু চি

25
রোহিঙ্গা সংকটের ৩ কারণ: তেল, ব্যর্থ গণতন্ত্র ও ভণ্ড সু চি

সুনির্দিষ্ট পরিসর বিবেচনায় বলা যায় যে, মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সু চি একজন ভণ্ড নবী ছাড়া আর কিছুই নয়।

চুক্তি হওয়ার পর ৩ সপ্তাহে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে সু চি প্রমাণ করলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন তার দেশে পা রাখতে যাচ্ছেন বলে এমন ভণ্ডামীপূর্ণ বাক্যবাণে বাংলাদেশকে তিনি জর্জরিত করতে চাচ্ছেন।

হিসেব কষে রাখাইন থেকে মিয়ানমারের এক জেনারেল মং মংকে সরিয়ে নেওয়া ছাড়াও দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত নয় বলেও তথাকথিত এক প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। অথচ সু চি রাখাইন পরিদর্শনে যেয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে একটি বাক্যও ব্যবহার করেননি।

সেই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, যিনি সেখানে লাখ লাখ মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়ে বিশেষ ইকোনোমিক জোন গড়ার পরিকল্পনা করছেন। কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিশ্চুপ থাকায় সু চি যা ইচ্ছে তাই করছেন।

সু চি একসময়ে বিশ্বের কাছে ‘ডেমোক্রেসি আইকন’ বা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলো তাকে এমন তকমা এঁটে দেন চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ও ইয়াঙ্গুনের নীতির সঙ্গে সুপরিচিত ছিল না। সু চি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন নির্বাচিত একটি সরকার নিয়ে গণতন্ত্রের পথে তার দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আসলে ধাপ্পা ছাড়া আর কিছুই নয় কারণ গণতন্ত্রের অভাবেই সংখ্যা লঘু রোহিঙ্গা হত্যাযজজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব হয়নি এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশকে বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার যে ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এখন আন্তর্জাতিক বিশ্বকে একই ধরনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সু চি। তার এ ধরনের অবস্থান পুরো এশিয়াকে অদূর ভবিষ্যতে নিরাপত্তাহীন করে তোলার মত ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

অথচ এ সু চিকেই সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ওমেন’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিলেন। তারপর সু চি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন, রানি, প্রেসিডেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন, স্মরণীয় ভাষণ দিয়েছেন, দুই হাতে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। তার মুখ তখন নির্যাতন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের খই ফুটত। অথচ তার সরকারের ওপর সেনাবাহিনী ভেটো ক্ষমতার মতই শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

মহান ‘মানবতাবিরোধী’ তার সরকার, সামরিক ও পুলিশ বাহিনী যখন একটি জাতিগত শুদ্ধি অভিযান শুরু করে বিশ্বের সর্বাধিক নিপীড়িত রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর তখন সু চি একদম ‘লা জবাব’ বনে যান। নিরীহ নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর উগ্র বৌদ্ধরা যখন বর্বরতা ও সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে গেছে তখন তা বারবার অস্বীকার করে গেছেন সু চি।

শত শত রোহিঙ্গা মসুলমানকে হত্যা করা হয়েছে, নাফ নদীতে তাদের লাশ ভেসে উঠেছে, ভয়ার্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষ জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা পায়নি, নির্বিচারে ধর্ষণ ও তাদের বাড়ি ঘর অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে যা গত কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গা নির্যাতনেরর পুনরাবৃত্তি মাত্র। এ কারণেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে এধরনের সহিংসতাকে ‘হরর’ অভিহিত করে তা বন্ধ করার আহবান জানান।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের জাতিগত যে শোষণ চলে তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায়। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে মিয়ানমারে এক প্রধান অস্ত্রদাতা দেশ ইসরায়েল। অনেক দেশ মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার কোনো ইচ্ছা তার দেশের নেই।

এই অস্ত্র শুধু রোহিঙ্গা নয় মিয়ানমারের উত্তরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হচ্ছে। গত বছর আগস্টে ইসরায়েলের অস্ত্র তৈরি প্রতিষ্ঠান ‘টিএআর’ গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করে তাদের অস্ত্র মিয়ানমার সেনাবাহিনী ব্যবহার করতে শুরু করছে। গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে ইসরায়েল কেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিশ্চুপ রয়েছে?

জীবন, সম্ভ্রম রোহিঙ্গারা হারালেও বহুজাতিক তেল কোম্পানি শেল, ইএনআই, টোটাল, শেভরন সহ বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নজর এখন মিয়ানমারের তেল সম্পদের ওপরে। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চীন নিয়ন্ত্রণ করে আসলেও সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না দেশটি। সু চি ক্ষমতায় আসার পর দেশটির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি কিন্তু তেল সম্পদ আহরণ ও বিনিয়োগ কিংবা ভূকৌশলগত প্রভাব বিস্তারে বৃহৎ দেশগুলোর স্বার্থ ও নিশ্চুপ থাকার মূল্য দিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা।

অস্টম শতাব্দী থেকে রোহিঙ্গারা রাখাইনে বাস করতে শুরু করলেও এবং তারা আরব ব্যবসায়ীদের কাছে ইসলাম সম্পর্কে অভিহিত হতে থাকলেও ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা রাখাইন দখল করে নেওয়ার পরই তাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গারা সমর্থন জানালে বৌদ্ধরা তা কখনো ভাল চোখে দেখেনি।

১৯৬২ সালে দেশটিতে সেনা শাসন শুরুর পর ১৯৭৭ সালে ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ চালানো হয় যার প্রেক্ষিতে ২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস অব্যাহত রয়েছে এবং এদেশে তাদের সংখ্যা কয়েক দফায় ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া সাগরে ভেসে আশ্রয়ের সন্ধানে হাজার হাজার রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে কিংবা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ায় তাদের মধ্যে ভাগ্যবানরা আশ্রয় পেয়েছে কিংবা গণকবরে ঠাঁই মিলেছে।

১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে এক আইন পাশ করে। তাদের ওপর প্রতিটি নির্যাতনের অধ্যায় বর্বর থেকে বর্বরতম অবস্থায় পৌঁছেছে কেবল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একপ্রকার চুপ থাকার মাঝেও খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, রোহিঙ্গারা শান্তিপ্রিয় ভাল মানুষ, তারা আমাদের ভাই ও বোন। তাদের নিজদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আহবান সু চির কানে পৌঁছেনি। অধিকাংশ আরব ও মুসলিম দেশগুলো এব্যাপারে নিরবতা পালন করেছে।

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার ওবর্ন রাখাইনের সিতুই থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বরে ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানান, গত ৫ বছরে শহরটিতে ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের মধ্যে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা থাকলেও এখন তা ৩ হাজারে নেমেছে। এরা কাঁটতারের বেড়ায় ঘেরা আশ্রয়কেন্দ্রে বন্দী। যাদের আগে বাড়ি ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জীবিকা সবকিছুই ছিল।

যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মত দেশগুলো মিয়ানমারে গুপ্তধন তেলের সন্ধান ও বিনিয়োগের জন্যে মরিয়া তখন দেশটিতে কি গণতন্ত্র, কি মানবাধিকার থাকুক না থাকুক, রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ ঘটুক তাতে এসব দেশের কিছুই আসে যায় না।

সৌদি আরবে গণতন্ত্র না থাকলে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নির্বাচন না থাকলে ইসরায়েল যেমন কখনো কথা বলে না তেমন রাশিয়া, ভারত কিংবা আসিয়ানের রোহিঙ্গা নির্যাতনে কিছুই যায় আসে না। যখন শত শত রোহিঙ্গা নারীকে নির্বিচারে গণধর্ষণ করছে উগ্র বৌদ্ধ ও মিয়ানমারের সেনারা তখন দালাইলামা বুদ্ধের শান্তিবাণী পুনরায় শোনাচ্ছেন কিংবা অনেক দেশ নিদেন পক্ষে কিছু ত্রাণ দিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বারাক ওবামা প্রশাসন সু চি ও তার দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মিয়ামারের গণতন্ত্রের নতুন দ্বারের উম্মোচনের কথা বলেছিল। মিয়ানমারে বিনিয়োগে মার্কিন প্রশাসনের অনুমোদনও প্রয়োজন। তারা কেন রোহিঙ্গা গণহত্যার মত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন? বরং মিয়ানমারের এ সহিংসতা আশেপাশের দেশগুলোসহ এশিয়ার অন্যান্য ছড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না অস্ত্র বিক্রির বহর ও পাল্লা দেখে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে কি বিশ্ববাসী গত কয়েক দশক ধরে তা দেখছে না?

তো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন মিয়ানমার সফরে এলে দেশটির সঙ্গে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু বিনিয়োগ হয়ে ওঠা খুবই স্বাভাবিক। একদিকে মিয়ানমারের সম্পদ, মার্কিন-চীনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চীনের মোকাবেলায় মিয়ানমারের নিকটে ভারতের আরো কাছের বন্ধু হয়ে ওঠা, গণতন্ত্রেও জন্যে সু চির বিজয়ী প্রত্যাবর্তন পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠার মধ্যে আসিয়ানের আতঙ্কিত নীরবতা এক ধরনের নির্ধারিত কৌশল অনুসরণ করছে।

রোহিঙ্গারা বেঁচে থাক বাংলাদেশের আশ্রয় কেন্দ্রে, সাহায্য যা লাগে তা দেবে জাতিসংঘ এই ধরনের সমীকরণের বাইরে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অন্য কোনো অবস্থান চোখে পড়ছে না। ধর্মীয় কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ততটুকুই সরব হয়ে ওঠে যতটুকু প্রয়োজন। তারা কখনো এরচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ নিয়ে কথা বলবে না, কারা দেশটিকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে সে নিয়েও মাথা ব্যথা নেই।

এজন্যে হয়ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিশপ দেসমন্ড টুটু সু চির চোখ বন্ধ করে থাকা দেখে কিছুটা অবাক হয়েছেন। সু চি সেই ব্যক্তি যে কি না ১৫ বছর গৃহবন্দী থেকে সামরিক জান্তার ধকল সহ্য করে এক বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হয়ে উঠেছেন, তিনিই যদি রোহিঙ্গা সহিংসতার কথা অস্বীকার করে চলেন, তাহলে তার কানে কানে বলতে ইচ্ছা হয়, ‘যদি আপনি অবিচারের পক্ষে নিরপেক্ষ হন তাহলে আপনি অত্যাচারীদের পক্ষই বেছে নিয়েছেন’।

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...