গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বস্তা বস্তা টাকা ও অসহায় সেনাপ্রধান

5043
গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বস্তা বস্তা টাকা ও অসহায় সেনাপ্রধান

২০০৫ সালের ১৫ জুন। নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ। প্রধানমন্ত্রী সে সময় দেশে

নেই। পরদিন সকালে সেনা সদরে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলেন নতুন সেনাপ্রধান।

শহীদ মঈনুল হোসেন রোডের সামনে এসেই দাড়িয়ে গেল গাড়ি। ক্যান্টনমেন্ট সেনাপ্রধানের গাড়ি সাধারণত আটকে থাকে না। তবে, শহীদ মঈনুল হোসেন রোডের ব্যাপারটা আলাদা। এখানে প্রধানমন্ত্রী থাকেন। কিন্তু সেদিন প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে। এডিসি গাড়ি থেকে নেমে মিলিটারি পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন।

মিলিটারি পুলিশ বললেন, ‘মামুন সাহেব বেরুবে।’ এডিসি ফিরে এসে সদ্য সেনাপ্রধানকে জানালেন। ভ্রু কুচকে মঈন ইউ আহমেদ জানতে চাইলেন, ‘হু ইজ দিস মামুন।’ সেনাপ্রধান প্রথম জানলেন, গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের নাম। তাঁর কথায় তটস্থ থাকে ক্যান্টনমেন্ট, প্রশাসন। সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় তাঁর মাধ্যমে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। দিনের পর দিন সেনা সদরে অভিযোগ আসতে থাকল। মামুন রাস্তা আটকে ক্যান্টনমেন্টে চলাফেরা করেন। রাত বিরাতে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন। প্রধানমন্ত্রীকে এ নিয়ে ব্রিফ করলেন ডিজিএফআইয়ের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী শুনলেন কিছু বললেন না।

সেনাপ্রধান তাঁর ঘনিষ্ট তিনজন অফিসারের সঙ্গে কথা বললেন। পরিকল্পনা করা হলো মামুনের গাড়ি আটক করা হবে এবং গাড়িতে তল্লাশি চালানো হবে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যে করার জন্য সেনাপ্রধান নির্দেশ দিলেন। সবচেয়ে চৌকশ অফিসার এবং জওয়ানদের দিয়ে একটি গ্রুপ গঠন করা হলো।

আর গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু হলো। দেখা গেলো প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি, মন্ত্রী, এমপিরা তাঁর সাক্ষাতের জন্য মুখিয়ে থাকেন। সরকারি সব কাজ বণ্টনের এখতিয়ার মামুনের।

তিন দিন পর জাহঙ্গীর গেটে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের গাড়ি বহর আটকে দিল সামরিক বাহিনীর সেই সদস্যরা। মামুন প্রথমে চিৎকার চেঁচামেচি করেন। ধমক দেন। সেনা সদস্যদের হুমকিও দেন তিনি। এক পর্যায়ে ফোন করার জন্য মোবাইল ফোন বের করেন। তরুণ মেজর তাঁর মোবাইল কেড়ে নেন।

মামুনের গাড়ি তল্লাশি শুরু করেন সেনা সদস্যরা। গাড়িতে পাওয়া যায় আট বস্তা টাকা, ১০টা রয়েল স্যালুট হুইস্কি, ১০ কার্টন রেড ওয়াইন এবং সিগারেট। মামুনের ব্রিফকেসে পাওয়া যায় ২০ হাজার ডলার।

সেনা সদস্যরা সিজার লিস্ট তৈরির কাজ শুরু করে। প্রথম বস্তায় পাওয়া যায় ৮০ লাখ টাকা। কাজ চলছে এরকম সময় দুই উর্দ্ধতন সেনা কর্মকর্তার গাড়ি এসে দাড়ায় জাহাঙ্গীর গেটের ওয়েটিং কাউন্টারের সামনে। সেনা সদস্যরা যারা মামুনের গাড়িতে আটক জিনিসপত্রের তালিকা করছিল, তারা স্যালুট করে দুই উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে। তারা সেনা সদস্যদের তীব্র ভৎর্সনা করেন।

অবিলেম্বে মালামাল গাড়িতে ওঠানোর নির্দেশ দেন। মেজর আপত্তি জানালে একজন তীব্রস্বরে চিৎকার করে ওঠেন। কয়েক সেকন্ডে সময় লাগে সবগুলো মালামাল গাড়িতে ওঠাতে। গাড়ি ছুটে যায় শহীদ মঈনুল সড়কের দিকে। দুই উর্দ্ধতন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর গেটের সামনে রাখা সিসিটিভির সব রেকর্ডিং মুছে দিলেন। মেজরের কাছে জানতে চান, কার নির্দেশে তারা এটা করেছে। মেজর কিছুতেই মুখ খুললেন না।

ঘটনা অনেকদূর পর্যন্ত গড়াতে পারতো কিন্তু গড়ায়নি। বেগম জিয়ার হস্তক্ষেপে। তবে তারপর থেকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

উর্দ্ধতন যে দুই কর্মকর্তা সেদিন মামুনকে বাঁচিয়েছিল, তারা দুজনই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি। আর ওই মেজর রাগে-দুখে অপমানে চাকরি ছেড়ে দেন। এখন একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন।

গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এখন অনেক মামলায় দণ্ডিত হয়ে জেল খাটছেন।

শেয়ার

আপনার মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...